IQNA

19:08 - April 10, 2019
সংবাদ: 2608307
১৪০২ চন্দ্র-বছর আগে ৩৮ হিজরির ৫ ই শা'বান তথা খৃষ্টীয় ৬৫৮ সালের চৌঠা জানুয়ারি মদিনায় জন্ম গ্রহণ করেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য হযরত আলী ইবনে হুসাইন (আ.)।

বার্তা সংস্থা ইকনা: জাইনুল আবেদিন ছিল তাঁর উপাধি যার অর্থ সাধকদের অলঙ্কার বা সৌন্দর্য। ইমাম হুসাইন (আ.)’র পুত্র ইমাম জাইনুল আবেদিনের মূল নাম হল আলী। অত্যধিক সিজদার জন্য তিনি ইমাম সাজ্জাদ নামেও খ্যাত। কারবালার মহাবিপ্লবের সময় তিনি সেখানে থাকা সত্ত্বেও অসুস্থতার কারণে এই জিহাদে অংশ নিতে পারেননি এবং মহান আল্লাহর ইচ্ছায় জল্লাদদের হাতে পড়েও অলৌকিকভাবে বেঁচে যান যাতে নবী-বংশ টিকে থাকে ও মানুষ তাঁদের মাধ্যমে সুপথ পেতে পারে।

পিতা ইমাম হুসাইন (আ.)'র পর নতুন ইমাম হিসেবে তিনি কুফা ও দামেস্কে জালিম শাসকদের দরবারে বীরত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়ে তাদের আতঙ্কিত করে তোলেন। তাঁর বীরত্বপূর্ণ ভাষণের প্রেক্ষাপটে গণ-বিদ্রোহের ভয়ে আতঙ্কিত জালিম ইয়াজিদ কারবালা থেকে বন্দী করে আনা নবী-পরিবার ও ইমামের সঙ্গীদেরকে মুক্তি দিতে এবং তাঁদেরকে সসম্মানে মদিনায় পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হয়।

ইসলাম ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা ও চেতনা রক্ষা ইমাম জাইনুল আবেদিনের ইসলামী সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের কাছে চির-ঋণী। 'সহিফায়ে সাজ্জাদিয়া' নামে তাঁর দোয়া ও মুনাজাতের অমর গ্রন্থটি আত্মিক পরিশুদ্ধি ছাড়াও সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংস্কারের নানা দিক-নির্দেশনায় সমৃদ্ধ। ইমামের রেখে যাওয়া 'রিসালাতাল হুক্বুক্ব' শীর্ষক অধিকার সংক্রান্ত নির্দেশনা মানবাধিকার বিষয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণার চেয়েও বিস্তারিত ও আধ্যাত্মিক ঔজ্জ্বল্যে ভরপুর। মহান আল্লাহকে অশেষ ধন্যবাদ যিনি মানবজাতিকে উপহার দিয়েছেন এমন এক আদর্শ মহামানব।

অশেষ সালাম ও দরুদ পেশ করছি এই মহান ইমামের শানে এবং সবাইকে জানাচ্ছি মুবারকবাদ।

কারবালায় ইয়াজিদের সেনারা ইমাম জাইনুল আবেদিনকে হত্যা করতে গিয়েও তাঁর ফুফু জাইনাব (সা.)'র প্রতিরোধের মুখে এই মহান ইমামকে জীবিত রাখতে বাধ্য হয়। পরবর্তীকালেও আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান । আসলে মহান আল্লাহই এভাবে তাঁকে মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব দেয়াসহ কারবালার কালজয়ী বিপ্লবের পরবর্তী অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্ত করা ও এ বিপ্লবের প্রকৃত বাণী মুসলমানদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্যে জীবিত রেখেছিলেন।

কারবালার ঘটনার পর ইমাম জাইনুল আবেদিন ও তাঁর বোন হযরত জাইনাব (সা.) যদি জীবিত না থাকতেন তাহলে কারবালার শহীদদের আত্মত্যাগ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংঘটিত ঐ বিপ্লবকে নিছক একটা দুর্ঘটনা বলে প্রচার করার ইয়াজিদি চক্রান্ত সফল হতো। উমাইয়া শাসকরা তখন এটাও প্রচার করতো যে ইমাম হুসাইন (আ.) ইয়াজিদের মতো তাগুতি শাসকের শাসন মেনে নিয়েছিলেন। আর এর ফলে পবিত্র ইসলাম ধর্মকে অবিচারের ব্যাপারে আপোষকামী ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ষড়যন্ত্রও সফল হতো।

কিন্তু মহান আল্লাহর ইচ্ছায় হযরত ইমাম সাজ্জাদ ও জাইনাব (সা.) কারবালা থেকে বন্দী অবস্থায় কুফা ও দামেস্কে যাবার পথেই স্বল্প সময়ে জনগণকে জানিয়ে দেন যে কারবালায় প্রকৃত ঘটনা কি ঘটেছিল এবং কারা ছিল ইসলামের জন্যে নিবেদিত-প্রাণ ও কারা ছিল ইসলামের লেবাসধারী জালেম শাসক মাত্র।

কুফায় ইবনে জিয়াদের দরবারে এবং দামেস্কে ইয়াজিদের দরবারে জয়নুল আবেদিনের তেজোদৃপ্ত ও সাহসী ভাষণ জনগণের মধ্যে এমন জাগরণ সৃষ্টি করে যে পরবর্তীকালে সে জাগরণের জোয়ারে ভেসে গিয়েছিল তাগুতি উমাইয়া শাসকদের তাখতে তাউস।

ইমাম সাজ্জাদ (আ.) কারবালায় নবী-বংশের ওপর উমাইয়া শাসক ইয়াজিদের পাশবিক হত্যাযজ্ঞ এবং এক অসম লড়াইয়ে ইমাম হুসাইন (আ.)সহ ও তাঁর নিবেদিত-প্রাণ সঙ্গীদের বীরত্বব্যঞ্জক শাহাদতসহ নবী-পরিবারের মহিলাদের সাথে অন্যায় আচরণের মতো ঘটনাগুলোর স্মৃতি মুসলিম মানসে চিরজাগরুক রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি এ লক্ষ্যে কারবালার ঘটনার স্মরণে শোক অনুষ্ঠানের প্রচলন করেছিলেন। ফলে শোক পরিণত হয়েছিল ঈমানী শক্তিতে তথা অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের একটি শক্তিশালী হাতিয়ারে এবং শহীদদের রক্ত বিজয়ী হয় জালিমের তরবারির ওপর।

আর এরই ধারাবাহিকতায় আজো মুসলমানরা কারবালার বীর শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে নিজ ঈমানকে সব ধরনের অশুভ শক্তির মোকাবেলায় শানিত ও প্রস্তুত করেন।

কারবালার বিপ্লবের ধারাবাহিকতা ও এর প্রভাব ছড়িয়ে দেবার প্রচেষ্টার পাশাপাশি ইমাম সাজ্জাদ (আ) ইসলামের নামে বিকৃত চিন্তা ও কুসংস্কার মোকাবেলার জন্যে জনগণের মধ্যে পবিত্র কুরআন-হাদিসের প্রকৃত শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে থাকেন। ফলে তাঁর সুযোগ্য ছাত্ররা পরবর্তীকালে মুসলিম জাহানকে জ্ঞান ও সত্যের পথে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হন। আর এর ধারাবাহিকতা আজও অব্যাহত রয়েছে। ইমাম জাইনুল আবেদিন বা ইমাম সাজ্জাদ (আ.) যোগ্যতা ও গুণাবলীতে ছিলেন এমন এক উচ্চতর স্থানে যার ওপরে রয়েছে শুধু নবী-রাসূল ও তাঁর পিতা ও পিতামহের স্থান।

তাঁর সুনামের কারণ শুধু রাসূল (সা.)’র প্রিয় দৌহিত্রের সুযোগ্য পুত্র বা আহলে বাইতের সদস্য হিসেবে নয়, অকল্পনীয় মাত্রার ইবাদত, উদারতা, খোদাভিরুতা, খোদার ভয়ে ক্রন্দন, অতুল জ্ঞান, দানশীলতা ও বিনয়ের কারণেও তাঁর সুনামও ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্র।

ইমাম জাইনুল আবেদিন(আ.) সফরে বের হলে অপরিচিত ব্যক্তির কাছে (আ.) কখনও রাসূলের বংশধর বলে পরিচয় দিতেন না যাতে লোকজন তাঁকে বিশেষ চোখে না দেখে। সত্য প্রচারে তাঁর সাহসিকতার প্রমাণ কুফা ও দামেস্কের দরবারেই সীমিত ছিল না। একবার খলিফা আবদুল মালিক ইমাম সাজ্জাদের (আ.) কাছে কিছু উপদেশ প্রার্থনা করলে তিনি বলেন, পবিত্র কুরআনের উপদেশের চেয়ে বড় উপদেশ আর কি হতে পারে? পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে-যারা ওজনে কম দেয় তাদের জন্যে আক্ষেপ, যখন কম ওজনদাতার ব্যাপারে আল্লাহ এতো কঠোর কথা বলেছেন তখন তার ( বা, তোমার মতে ব্যক্তির ) অবস্থা কেমন হতে পারে যে জনগণের সমস্ত সম্পদ লুট করেছে?

সহিফায়ে সাজ্জাদিয়া ইমাম জাইনুল আবেদিনের (আ.) এক অনন্য সৃষ্টি। ইমাম সাজ্জাদের বেশিরভাগ বিখ্যাত দোয়া স্থান পেয়েছে এ সংকলনে। মত প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় তিনি তাঁর বিভিন্ন প্রাণস্পর্শী দোয়া, আকুতি, মোনাজাত ও বাণীর মাধ্যমে মানুষকে বিভিন্ন দিকে শিক্ষা দিয়ে গেছেন। এসব দোয়ায় আত্মিক পরিশুদ্ধির জ্ঞান ছাড়াও রয়েছে খোদা পরিচিতি, বিশ্বদৃষ্টি, মানুষের পরিচিতি, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দিক নির্দেশনা।

ইমাম সাজ্জাদ (আ.)’র রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তৎপরতা যখন সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে তখন তা উমাইয়া শাসকদের জন্যে অসহনীয় হয়ে ওঠে। তাই তৎকালীন উমাইয়া শাসক ওলীদ বিন আবদুল মালিক ইমামকে শেষ পর্যন্ত বিষ প্রয়োগে শহীদ করে। আর এভাবেই ইমাম সাজ্জাদ (আ.)’র বরকতপূর্ণ ও বর্ণিল জীবনের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু ইমাম সাজ্জাদের পথ নির্দেশনা তাঁর সন্তান ও অনুসারীদের মাধ্যমে অমর হয়ে আজো আলো বিকিরণ করে চলেছে।

মাম জাইনুল আবেদিন (আ.)'র জীবনে বহু মু'জেজা বা অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে।

যেমন, অসুস্থ ব্যক্তিকে অলৌকিকভাবে সুস্থ করা, অদৃশ্যের খবর বলে দেয়া বা জানা, বন্দী অবস্থায় আবদুল্লাহ বিন মারোয়ানের প্রহরীদের কাছ থেকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।

অশেষ সালাম ও দরুদ পেশ করছি এই মহান ইমামের শানে এবং সবাইকে আবারও জানাচ্ছি মুবারকবাদ।

ইমাম সাজ্জাদ (আ.)'র কয়েকটি অমূল্য বাণী শুনিয়ে ও তাঁর জন্ম-বার্ষিকী উপলক্ষে আরো একবার এ মহামানবের প্রতি অজস্র সালাম আর দরুদ জানিয়ে শেষ করছি আজকের এই আলোচনা। ইমাম সাজ্জাদ বলেছেন,

- আমি তাদের ব্যাপারে বিস্মিত যারা ক্ষতির কারণে বিভিন্ন ধরনের খাবার বর্জন করে অথচ তারা কদর্যতার কারণে পাপ বর্জন করে না।

- তোমরা বেহেশতে সর্বোচ্চ স্থান লাভের চেষ্টা করবে। তোমরা মনে রেখো যারা অপর ভাইয়ের প্রয়োজন মেটায় এবং দীন-দুঃখীদের সাহায্য করেন কেবল তাদেরকেই বেহেশতে সর্বোচ্চ স্থান দেয়া হয়ে থাকে। পার্সটুডে

নাম:
ই-মেল:
* আপনার মন্তব্য: